লোডশেডিং এর জন্য কারা দায়ী ? তাদের কি শাস্তি পাওয়া উচিত? লোডশেডিং কেন হয়? এই সকল বিষয়ে আজ আমরা বিস্তারিত জানব । চলুন শুরু করা যাক- একটি দেশের বিদ্যুৎ সেবা ৩ টি ধাপে পরিচালিত হয়। সেগুলো হলো -জেনারেশন, সঞ্চালন, বিতরণ ।
ধাপ গুলো চিত্রের মাধ্যমে দেখানো হল-

জেনারেশন
জেনারেশন মানে হল বিদ্যুৎ উৎপাদন। দেশে এই কাজটি করে থাকে পিডিবিসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এর নিয়ন্ত্রাধীন বিভিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো।
সঞ্চালন
দেশে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে দিয়ে দেয়া হয়। বিষয়টি এমন নয় যে আপনার বাড়ির পাশে বিদ্যুৎ কেন্দ্র থাকলেই আপনাকে সেখান থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ দিয়ে দেয়া হবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ আগে জাতীয় গ্রীডে আসবে। আর গ্রীড থেকেই সারা দেশে সঞ্চালন করা হবে।পুরো বাংলাদেশের গ্রীড সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করে পিজিসিবি (পাওয়ার গ্রীড কোম্পানি বাংলাদেশ)। পিজিসিবি এর আরেকটি প্রতিষ্ঠান হল এনএলডিসি( ন্যাশনাল লোড ডিসপাচ সেন্টার)। তারাই মূলত দেশের কোথায় লোড শেডিং দেয়া হবে। কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদন এ যাবে কোন কেন্দ্র কখন বন্ধ থাকবে এসব নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর তা পিজিসিবি এর ১৩২ কেভি বা তদোর্ধ্ব সঞ্চালন লাইন এর মাধ্যমে সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেয়া হয়।

বিতরণ
তারপর পিজিসিবি এর গ্রীড সাবস্টেশন থেকে ৩৩ কেভি লাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন বিতরণ সংস্থা; যেমন- আরইবি’র আওতাধীন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিসমূহ, ওজোপাডিকো, নেসকো, ডিপিডিসি, ডেসকো ইত্যাদির কাছে পাঠানো হয়। তারপর বিতরণ সংস্থা গুলো ১১ কেভি লাইনের মাধ্যমে গ্রাহক প্রান্তে পৌঁছায়। এভাবেই ধাপে ধাপে উৎপন্ন বিদ্যুৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে মানুষের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছায় যার মূলে রয়েছে হাজারো বিদ্যুৎ কর্মীর ত্যাগ ও পরিশ্রম।
পল্লীবিদ্যুৎ বা এরকম অন্যান্য বিতরণ সংস্থা গুলো সেবা কার্যক্রম সরাসরি জনগণ এর সাথে জড়িত থাকার ফলে যেকোন ব্যক্তিগত আক্রমণ বা আক্রোশ এসব বিতরণ প্রতিষ্ঠান এর উপর এসে থাকে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লোডশেডিং এ বিতরণ সংস্থার কোন কিছু করার থাকে না। পাওয়ার গ্রীডের ট্রান্সফর্মার এর ক্যাপাসিটি যদি চাহিদার তুলনায় কম থাকে বা জাতীয় গ্রীডে উৎপাদন কম থাকে সেক্ষেত্রে তাদের নির্দেশেই লোড শেডিং করা লাগে পিজিসিবির রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বন্ধ রাখতে হয় বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে। বর্তমানে যে সংকট চলছে তার প্রধান কারণ হলো প্রচন্ড তাপদাহ, সন্ধ্যার পর ব্যাপক হারে বিদ্যুৎ এর চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়া। মার্কেটে মার্কেটে লাইটিং,শীতাতপ যন্ত্র ব্যবহারসহ বিভিন্ন কারণে পিক আওয়ারে প্রচুর বিদ্যুৎ এর চাহিদার সৃষ্টি হয়।এই ব্যাপক চাহিদার যোগান দিতে হিমশিম খেতে হয় পিজিসিবি এর গ্রীড সাবষ্টেশন গুলোকে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে বিতরণ প্রতিষ্ঠানকে লোড শেডিং করায়।
আরইবি’র আওতাধীন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিসমূহ নিজে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না। তারা শুধুমাত্র গ্রীড থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে গ্রাহক পর্যায়ে বিতরণ করে। ফলে গ্রীড সমস্যাজনিত কারণে লোডশেডিং করে থাকলে এক্ষেত্রে বিতরণ সংস্থার অফিসারদের কিছু করার থাকে না। জাতীয় স্বার্থে লোডশেডিং করানো হয়। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিসমূহের অফিসার যদি গ্রীডের কথা না মেনে আবেগপ্রবণ হয়ে লোডশেডিং না করায় সেক্ষেত্রে গ্রীড তাদের সিস্টেম বাঁচাতে বাধ্য হয় ৩৩ কেভি লাইন বন্ধ করে দিতে।

তার মানে এটা পরিষ্কার যে চাইলেও সংকটের সময় বিদ্যুৎ দেয়া সম্ভব নয়। লোডশেডিং কারো প্রয়োজন অনুযায়ী করা সম্ভব নয়।অনেকেই বলে থাকেন ইফতার তারাবি সাহরী ছাড়া যেকোন সময় লোডশেডিং করান। আসলে ব্যাপারটা বলা যত সহজ বাস্তবতা তত সহজ নয়। যখনই চাহিদা বেশি ওই সময়টাতেই চাহিদা এবং যোগানের ভারসাম্য রক্ষার জন্য লোডশেডিং করতে হবে। অন্যথায় সিস্টেমের মারাত্বক ক্ষতি হবে পরে যা কাটিয়ে উঠতে হয়ত পুরো একটি জেলাকেই দীর্ঘসময় বিদ্যুৎ বিহীন থাকা লাগতে পারে। তাই আবেগী হয়ে মারমার কাটকাট বা চাকরি ছেড়ে চলে যান এ জাতীয় কথা বলা সহজ বাস্তবতা ততই কঠিন। যে হুমকি দিচ্ছে তাকেও যদি ঐ অফিসারের চেয়ারে বসিয়ে দেয়া হয় সেও পারবে না বিদ্যুৎ দিতে। একটা সিস্টেমের টেকনিক্যাল ডিফিকাল্টিসগুলো অনুধাবন ও সহনশীল আচরণ করার জন্য সকলের প্রতি অনুরোধ রইলো।
বিস্তারিত ভিডিওতে-
